আড়ত থেকে পাইকারি, পাইকারি থেকে খুচরা— বাজারের সর্বস্তরে পেঁয়াজের দাম বেড়েই চলেছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজারে দেশি ও আমদানি করা ভারতীয় প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়।সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারগুলোতে দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১২ থেকে ১৩ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা বেড়েছে। আর এক মাসের ব্যবধানে এই দুই ধরনের পেঁয়াজের দাম যথাক্রমে ৩৯ ও ৫৫ শতাংশ বেড়েছে।ভারতে পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে। ভারতে দাম বাড়ার কারণে দেশে আমদানিও প্রায় অর্ধেক কমে এসেছে। এতে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বাড়ার সুযোগে বাড়ছে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের দামও।ভারতের কোনো অঞ্চলে খরা আবার কোনো অঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে পেঁয়াজের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সে দেশে পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। গতকাল ভারতের খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৮০ রুপি। দেশে পেঁয়াজের এই অস্বাভাবিক দাম বাড়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও। বাণিজ্যসচিব মাহবুব আহমেদ গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ বছর দেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে এবং রমজান মাসে যে পরিমাণ আমদানি হয়েছে, তাতে বাজারে ঘাটতি থাকার কথা নয়। চাহিদা পূরণ হয়ে যাওয়ার কথা। তার পরও কেন অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়ছে, তা খতিয়ে দেখতে আমদানিকারক, পাইকারি বিক্রেতাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ নিয়ে রোববার (আগামীকাল) বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে।’
রাজধানীর শ্যামবাজার দেশে পেঁয়াজের বৃহত্তম পাইকারি বাজার। সেখানকার আমদানিকারক ও পাইকারি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান পপুলার বাণিজ্যালয়ের স্বত্বাধিকারী রতন সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতকাল প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজের পাইকারি মূল্য ছিল ৫৪ থেকে ৫৬ টাকা। আর ভারতীয় পেঁয়াজ ছিল ৬০ থেকে ৬১ টাকা।’ যদিও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে গতকাল শ্যামবাজারে সীমিত বেচাকেনা হয় বলে জানান তিনি।
আর কারওয়ান বাজারে গতকাল প্রতি পাল্লা (পাঁচ কেজি) দেশি পেঁয়াজের দাম ছিল ৩০০ থেকে ৩১০ টাকা। আর ভারতীয় পেঁয়াজের প্রতি পাল্লার দাম ছিল ৩৫০ টাকা।
আবার রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া বাজারে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৭০ থেকে ৭২ টাকায়। এসব বাজারে হাতে গোনা কয়েকটি দোকানে ভারতের পেঁয়াজ বিক্রি হতে দেখা গেছে।
আমদানি চিত্র: একাধিক আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে পেঁয়াজের চাহিদার ৬০ শতাংশ পূরণ করা হয় ভারত থেকে আমদানি করে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত থেকে বেশি দামে পেঁয়াজ আমদানিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন কোনো কোনো ব্যবসায়ী। তাঁদের মতে, হঠাৎ দাম পড়ে গেলে তাঁদের বড় ধরনের লোকসান গুনতে হতে পারে। এই উভয়সংকটে পড়ে আমদানি অর্ধেকে নেমে এসেছে বলেও মনে করছেন তাঁরা।
সাতক্ষীরার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এসএম ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপক আমজাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার আমরা যে পেঁয়াজ আমদানি করেছি, সব ধরনের খরচ ও ন্যূনতম লাভ ধরে তার কেজিপ্রতি বিক্রয়মূল্য দাঁড়িয়েছে ৬৮ টাকা। কিন্তু এই দামে বিক্রি করতে না পারায় কয়েক গাড়ি পেঁয়াজ অবিক্রীত রয়ে গেছে। অথচ ঈদের আগে প্রতি কেজি পেঁয়াজ আমরা ৩৮ থেকে ৪০ টাকা দামে আমদানি করেছি।’
আমজাদ হোসেন আরও বলেন, ‘আগে আমরা প্রতিদিন গড়ে ১০ ট্রাক (প্রতি ট্রাকে ১৫-১৬ টন) পেঁয়াজ আমদানি করতাম। এখন দিনে ২-৩ ট্রাক পেঁয়াজ আমদানি করছি। লোকসানের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে আমদানি কমিয়ে দিতে হয়েছে।’
ভারতীয় পেঁয়াজের বড় অংশই আসে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে। একাধিক আমদানিকারক জানান, ঈদের আগে ভোমরা বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪০ ট্রাক পেঁয়াজ আসত। এখন আসছে ২০ থেকে ২৫ ট্রাক।
যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরকেন্দ্রিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হামিদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আবদুল হামিদ সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঈদের আগে পেঁয়াজ আমদানির জন্য কম দামে যেসব এলসি খুলেছিলাম, সেগুলো ইতিমধ্যে সে দেশের রপ্তানিকারকেরা বাতিল করে দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার ভারতের রপ্তানিকারকেরা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন, আগের দামে পণ্য সরবরাহ করা তাঁদের পক্ষে এখন আর সম্ভব নয়। সে দেশের সরকার প্রতি টন পেঁয়াজের রপ্তানিমূল্য বেঁধে দিয়েছে ৬৫০ ডলার। আগে ছিল ৪৫০ ডলার।’
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বিক্রেতা বায়েজিদ করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ হাসান বলেন, ‘দেশি ও আমদানি মিলিয়ে খাতুনগঞ্জের বাজারে পেঁয়াজের প্রতিদিনের স্বাভাবিক চাহিদা ৩২০ টন। কয়েক দিন ধরে পাচ্ছি মাত্র ৬০-৭০ টন। এর বেশির ভাগই দেশি পেঁয়াজ।’
পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, এটুআই, বিসিসি, ডিওআইসিটি ও বেসিস